দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো ও চীনের সরবরাহনির্ভরতা কমানোর অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার এ বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। খবর রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের এ উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ব্যাটারি প্রকল্প। এসব খনিজ আধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে এগুলো গাড়ি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতেও ব্যবহার হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে গত শুক্রবার খনিজ শিল্পের নির্বাহী, শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২০০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে বিনিয়োগের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের খনিজ শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করছে। প্রশাসনের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রেই প্রয়োজনীয় খনিজ উত্তোলন, পরিশোধন ও উৎপাদন করা। এতে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি শিল্প খাতও শক্তিশালী হবে।’
বিনিয়োগের অংশ হিসেবে সবচেয়ে বড় ঋণটি পাবে সিলা ন্যানোটেকনোলজিস। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটিকে শর্তসাপেক্ষে ১৪০ কোটি ডলারের ঋণ দেবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটাল (ওএসসি)।
এছাড়া স্ক্যান্ডিয়াম উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান সানরাইজ এনার্জি মেটালসকে শর্তসাপেক্ষে ৪০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চুম্বক তৈরির প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান নিরন ম্যাগনেটিকস পাবে ১৫ কোটি ডলারের শর্তসাপেক্ষ ঋণ।
যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকও তিনটি প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেবে। ওয়েস্টওয়াটার রিসোর্সেস, গ্লোবাল অ্যাডভান্সড মেটালস ও ফাইভ-ই অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালসকে মোট ৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণ দেয়া হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চাহিদা। ইরান সংঘাতের কারণে দেশটির অস্ত্রের মজুদ কমে গেছে বলে মনে করছে হোয়াইট হাউজ। এখন সে মজুদ পুনর্গঠনের জন্য বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের প্রয়োজন হচ্ছে।
নথি অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকবাহিনী বিপুলসংখ্যক নির্ভুল নিশানাভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। ফলে এসব অস্ত্রের মজুদ পুনরায় পূরণ করতে সময় লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতারা। বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু অস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠনে কয়েক বছরও লাগতে পারে। তবে অস্ত্রের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে—এমন প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকায় রয়েছে দুষ্প্রাপ্য খনিজ বা রেয়ার আর্থ, টাংস্টেন, জার্মেনিয়াম ও স্ক্যান্ডিয়াম। এসব খনিজ নির্ভুল নিশানাভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও ইনফ্রারেড সেন্সরসহ বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহকে এখন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও দেখছে ওয়াশিংটন। দীর্ঘদিন ধরে এসব খনিজের উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, এ নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও শিল্প খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের চীনা সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, কয়েক দশক ধরে চীন খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক খনিজের বৈশ্বিক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে বেইজিং শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন সরকারি সহায়তার মাধ্যমে সে ব্যবধান কমাতে চাইছে।
খনিজ শিল্পের জন্য দক্ষ জনবল তৈরিতেও অর্থ দিচ্ছে মার্কিন সরকার। গত শুক্রবার দেশটির জ্বালানি বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি স্বীকৃত খনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে। খনি শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের সহকারী সচিব অড্রে রবার্টসন বলেন, ‘খাতটিতে আরো শিক্ষার্থী আনার জন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ শিল্পে কাজের সুযোগ দেয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।’
অস্ট্রেলিয়ার সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ম্যাডেলিন কিং বলেন, ‘সানরাইজের স্ক্যান্ডিয়াম প্রকল্পে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উচ্চমানের পরিচিত স্ক্যান্ডিয়াম মজুদ রয়েছে। মহাকাশ, প্রতিরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে এ খনিজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে।’
ট্রাম্পের ঘোষিত বিনিয়োগের পরিমাণের বড় অংশ সরাসরি খনি প্রকল্পের পাশাপাশি ব্যাটারি, চুম্বক ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিতে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু খনিজ উত্তোলন বাড়াতে চাইছে না। উত্তোলনের পর সে খনিজ দেশেই প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তরের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে চাইছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে এ উদ্যোগ একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। একদিকে অস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব খনিজ শিল্পকে শক্তিশালী করা হবে।